ছোটবেলায় দেখতাম বিকেলের দিকে মিছিল বেরোতো। সামনে একটা টলি (ভ্যান গাড়ি)-তে একটা মাইক বাঁধা আর পিছনে অনেক লোকের দল; সামনের দিকে এমনি হাঁটা, আর পিছনের দিকের লোকগুলো সাইকেলগুলো হাতে ধরে হেঁটে হেঁটে যেত আর... সমস্বরে 'ইনক্লাব জিনাব্বাদ'(তখন সঠিক শব্দটা বা উচ্চারণ জানতাম না এটাই বুঝতাম); 'মানছি না মানব না', 'আমাদের দাবি মানতে হবে'। আবার 'বন্দেমাতরম্'।
দূর থেকে মিছিল আসছে শুনলেই একছুটে আমাদের দোকান ধারে বা সদর চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়াতাম। মিছিল আসছে! দেখব! কি ভালো লাগত! পাড়ার চেনা কাকারা হাসিমুখে দেখে ঘাড় নাড়ত! বেশ মজা হত। মিছিল চলে যাবার পর খেলতে খেলতে ওই শ্লোগানগুলো ওইরকমই সুরে বলে বলে খেলতাম। 'ভোটে যে দাঁড়াত' সে আমাদের বাড়ি ভোট চাইতে আসতই... কারণ আমাদের বাড়িতেই এক ডজন ভোটার। এসে ঠাকুমাকে প্রণাম করত। দেখতাম। প্রতিবার ভোটের এক হপ্তা আগে ঠাকুমা ভোট নিয়ে চিন্তা করত। 'ব্যালট কাগজে ভোটের স্ট্যাম্প দিলেই তো হল না, ঠিক মতো না মুড়তে পারলেই তো ল্যাপ্স হয়ে যাবে'। তখন কাকারা বোঝাত। রোজ পড়ন্ত দুপুর পাড়ার সব ঠাকুমাগুলো আমাদের বাড়ি জড়ো হত। বেলপুকুর পাড়ে বাগানের পাশে নতুন ঘরের চাতালটায় মাদুর পেতে বসে সব ঠাকুমারা গল্প করত। ভোটের কদিন আগে থেকে এই 'ব্যালট কাগজে স্ট্যাম্প' দেওয়া নিয়েই সবার চিন্তা আর আলোচনা চলত। ভোটের দিন ঠাকুমা, মা, মেজমা, পিসিরা কি সুন্দর মাড়ভাঙা কাপড় পরে ভোট দিতে যেত। আর ভোটের দিন মানেই সকালের জলখাবারে লুচি-আলুরদম আর মিহিদানা আর দুপুরে খাসির মাংস। এ একেবারে অলিখিত নিয়ম ছিল।
তারপর যেবছর ভোটার কার্ডের জন্য ছবি তুলতে যেতে হল সে তো যেন উৎসব! ধনিয়াখালি থেকে অনিল দাদু বলে একজন পুটলি মাথায় করে তাঁতের শাড়ি এনে আমাদের পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাড়ি বিক্রি করত। সন্ধ্যেবেলা অনিল দাদু এলে আমাদের বাড়ির দালানে মা, মেজমা, ছোট পিসি, ঠাকুমা সবাই গোল করে মাদুরে বসত শাড়ি পছন্দ করতে। সেবার ভোটার কার্ডের জন্য ছবি তুলবে বলেও নতুন শাড়ি কেনা হল সবার। তারপর সকাল থেকে হাইস্কুলে গিয়ে ছবি তোলার জন্য সে কি উন্মাদনা, কত আনন্দ, কত উত্তেজনা, কত হাসি মুখ! কিন্তু যখন ভোটার কার্ড গুলো এলো সে কি হাসাহাসি! কাউকে চেনার উপায় নেই! তখনও বেশ ক'দিন এই নিয়েই ইয়ার্কি-হাসাহাসি চলেছিল!
ভোট এলেই কেমন একটা খুশির ব্যাপার হয় তারকেশ্বরে। বড় হয়েও দেখছি এই আনন্দটা এখনও একই আছে। সাজগোজ করে সকাল সকাল ভোট দিতে যাওয়া, ভোটের ছুটিতে দুপুর বেলা জমিয়ে খাওয়াদাওয়া... বিকেলের দিকে টিভিতে শুধুই খবরের চ্যানেল...সেই একই আছে।
এরমই থাকুক। সবাই ভালো থাকুন। ভোট দিন।

Jhakasss...
ReplyDelete