শারদীয়া

একদশীর রাতে চন্দ্রানী হাসে
মাধবীলতার সুবাসে শিশিরের গায় কাঁটা দেয়।
মৃন্ময়ী মা দুগ্গার গালের সিঁদুর জলে ভেসে যায়-
মন খারাপের সুর বিসমিল্লার সানাইয়ে।
আজ বিজয়ার ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখ বিরহ ভুলতে চায়।
শরতের মায়াবী আকাশ, রাত পরীর এ রূপ কোন অজানা মোহের হাতছানি দেয়।
জেগে থাকি... এমনি শরতের পূর্ণিমাভাসা রাতের  আগামী সম্বোধনের অপেক্ষায়.... 'কো জাগরি?'
©Subhra Chakraborty

কবিতার জন্ম


সকল চাওয়ার মাঝে কেমন নিষ্পলক আকুতি।
যখন চাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটের ভাষা থমকে দাঁড়ায়-
তখন আয়নার ধুলো মুছতে
কবিতার নরম কাপড় লাগে। 
চিনচিনে বুকে তা চুপি চুপি জন্মায় 
যিশুর মতো... 
তার আভা লুকানো যায় না। 
কোন পাগলা তিন ভবগুরে সাধু 
আকাশের তারা গুনতে বেড়িয়ে 
সে কবিতার ছন্দের আভা খুঁজে নেয়। 
কবিতা প্রকাশিত হয়, এভাবেই, চিরকাল...॥

সবুজতা

প্রকৃতির কোলে বাস করেও জীবনটা বড় যান্ত্রিক।
গাছেদের নিবিড় ছায়ায় 
আমাদের যৌবন কেটেছিল।
আজ ছায়াও সঙ্গ ছেড়েছে!
এই একাকীত্ব সত্যের মতো নিষ্ঠুর।
খ্যাপার মতো খুঁজে খুঁজে ফিরি সবুজতা-
চারপাশে, জীবনে, মনের গহনে।
এই ব্যথাভরা বুকে এখনো আশার জায়গা আছে। 
আশা আছে। প্রাণ আছে।
এই বিশ্বাসে পড়ন্ত বেলার পড়ে ঘুম আসে।
আগামী ভোরের আশায়...॥

এখনো অপেক্ষায়

আমার প্রেম, দুঃখ, জড়তা, অভিমান, অপমানগুলো 
ঘুমুর করে সাদা বকের পায়ে বেঁধে দিয়েছি।
নীল আকাশের গায় সাদা মেঘ মেখে 
সে ঘুমুর বকের সাথে উড়ে যায়। 
বালিশে মাথা রেখে ভাবি হয়তো সেই বক গিয়ে বসেছে তোমার বাড়ির পাশের নদীপারে, 
শিশিরের জলে ভেজা নিঝুম রাতে।
ঘুমুরের সেই শব্দ তোমার কানের পাতায় হাত রাখে।
তুমি তা জানো না কিছু, 
ঘুমন্ত প্রাণ, কথা-গান-ভাষাহীন।
তবু আমার প্রাণের অনুভূতির সুরভী পাবে স্বপ্নের দেশে।
হলুদ ঘাসের ভিড়ে, মরণের ঘোরে, শুষ্ক নদীতটে-।
দেখবে আমি অনন্ত অপেক্ষায় তোমার জন্য একাকী বসে আছি, 
অনন্ত অপেক্ষায়...॥

আকাঙ্খা


পৃথিবীতে তিরিশ বছর কাটিয়ে দেবার পর এখন মাঝে মাঝে শৈশব পেয়ে বসে।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে মণি-মুক্তো ছড়িয়ে যায়
পুকুর ধারের পিয়াড়া গাছের ছায়ায়।
যেখানে আজও ঢিল দিয়ে টানা গন্ডীর ভিতর 'পাতা লুকোনো খেলার' কচি আমপাতা
লুকোনো আছে মাটির ভিতর।
মনে হয় আজ স্মৃতির পাতাল রেলে করে গিয়ে খুঁড়ে বের করি সেই পাতার টুকরো মোড়া
শৈশবের হাসি-আনন্দ-সরলতার শব।
আজ এই পরিণত পুরাতন শরীরে
বেঁচে ওঠ তোরা বিদ্রোহী কবিতার মতো।

নয়তো আয় হৃদয়ের ছায়ায়, গোধূলির মেঘে,
এই ডুবন্ত জাহাজের মাস্তুলে।

এখন অনেক রাত, আয় তোরা ভোরের স্বপ্ন হয়ে।

আমি অপেক্ষায় আছি।
থাকব অপেক্ষায়॥

আমার কথা


শহরের ভিড়ময় ফুটপাতে হাঁটতে 
বড় একা মনে হয় নিজেকে।
বন্ধুদের আড্ডায় যুক্তি-তর্কে ব্যস্ত আমার
দিনগুলো সিগারেটের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যায়।
বাড়িময় ছড়ানো মনখারাপের কবিতাগুলোর মাঝে
বাঁচার জন্য নিজেকে রূপকথায় ডোবাই।
ভরা পূর্ণিমার রাতে যখন শহর ভেসে যায়
তখন আমি মেঝেয় শুয়ে ঘুমোই।
তারপর তুই এলি।
এখন একটু নির্জনতা খুঁজি।
তোর আদর- শাসনে ডুবে যাই।
অমাবস্যার অন্ধকার রাতে মুঠোফোনে লেখা তোর নাম 
ঘুম কেড়ে নেয়।
মনে পড়েছে ভুলে যাওয়া সেই কথাটা,- 'বেঁচে আছি'।

মানস সন্তান

জ্বর গায়ে বিকেল বেলার রোদে অনুভব করি আদিমাতার স্পর্শ।
আধবোজা চোখে কাঁপন জ্বরের ঘোর আসে,
আম-নারকেল গাছের ছায়ার চাঁদোয়ায় যে পায়ে হাঁটা পথ চলে গেছে দিঘিপারে-
গিয়ে দেখি পানকৌড়ি আর সাদা বক ডুব দেয় কাচের মতো টলটলে জলে।
পাড়ের কাদামাটিতে পড়ে আছে রাধাচূড়ার হলুদ পাপড়ি
যেন আজও অনন্ত প্রেমিকের বংশীধ্বনির অপেক্ষায় পথ চেয়ে-।
আদিমাতার পরম মমতা সন্ধ্যারতি শেষে বৃষ্টি নিয়ে আসে।
আমি তখন পানকৌড়ির মত ডুব দিই অনন্ত জীবনের দিঘিজলে
ততই মনের গর্ভে কবিতা সন্তান জন্মায়॥

বলে রাখলাম

কত পথ ধুলো মাখা পায়ে হেঁটে গেলে 
তোমাকে পাবো? -জানি না।
কত হিম রাতের কুয়াশার ছায়া 
চোখের পাতায় পড়ে সরে গেল 
আজ আর মনে পড়ে না।
আমার নিজের মুদ্রাদোষে 
অন্ধকারের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে 
আমার হরিণি চোখ তোমাকে খুঁজে ফেরে।
যদি কোন শরৎ প্রাতে 
তোমার মনে আগমনীর সুর বাজে
সেদিন এসে দাঁড়িও 
এই রাধাচূড়ার পাপড়ির পাশে।
আমার অপেক্ষার জীবাশ্ম 
এখানেই রাখা থাকবে॥

বিশ্বাস

ডোবার ধারে ঘাসের বনে নীল-সাদা ফুলের সারি,
তারই পাশে তুলসী মঞ্জরী ছড়িয়েছিলাম।
কচি গাছ হয়েছে, 
বনফুলের গন্ধমাখা অযত্নে লালিতা এরা।
রোদে স্নান করে বেড়ে উঠছে।
বকুলের গন্ধে মোড়া দুপুরে এরা ঝিমিয়ে ঘুমায়।
মনে হয় যুগান্তের প্রবল পাপের ক্লেশ 
আমার তুলসীবনের পাশ দিয়ে ছুটে যায় বুঝি।
দূরে কোকিল ডাকে, মনে কু-ডাকে।
বুক দিয়ে আগলে রাখি 
আমার কচি সন্তানদের শৈশব।
জানি না, কতদিন পারব, 
জানি না কতদিন পারা যায়।
চাতকের মতো 
ঈশ্বরের দিকে মাথা তুলে চেয়ে থাকি, 
হৃদয়ের ভার জোরে কথা কয়,
ঈশ্বরের আশীর্বাদ 
জলভারনত মেঘ হয়ে 
তুলসীর মাথায় বারিধারা হয়ে ঝরে পড়ে।
আবার পৃথিবী প'রে বিশ্বাস জন্মায় 
কচি ঘাসের মাঝে, 
মনে হয় শত খারাপের ভিড়েও 
মাথা তুলে বেঁচে থাকা যায়॥

আত্মকথা

আমার মনের মধ্যে পরপর সাজানো
জীবনের অধ্যায়গুলো।
আনমনে পড়ে দেখে চুপ হয়ে যাই।

কখনো বা কাটাকুটি করি গাঢ় কালিতে
যেন নিজেই আর বুঝতে না পারি।

সেদিন পড়লাম একটা পাতা;
জীবনের নিকানো উঠোনে
কচি ধানের শিষ ছড়ানো,
লক্ষীপুজোর আল্পনা দেওয়া হচ্ছে।
পরের পাতায় অলক্ষী বিদায়ের আয়োজনের ভিড়!
পাতা ওল্টাতে গিয়ে পেলাম স্বজন হারানোর নিরাকার ব্যথা।

আমার আত্মজীবনীর আমিই একমাত্র পাঠিকা।
একদিন ছাই ভষ্ম হয়ে পৃথিবীর বুকে মিলিয়ে যাবে।

আকাশের গায়ে জলরঙে আঁকা
আমার পদচিহ্নের সারি।
মেঘের আনাগোনায় মিলিয়ে যাবে সব
কোন একদিন।
আমি এই অলিখিত নিরক্ষর পাণ্ডুলিপির পাতায় ধুলোমাখা হলুদ উপপল্লবের জীবাশ্ম যেন।
রেখে যাব কোন না বলা গল্পের রহস্য॥

তারকেশ্বর- আমার জন্মস্থান

ছোট থেকে দেখছি প্রতি শ্রাবণী মেলায় মানুষের ভিড়। পরম শ্রদ্ধায় তারকনাথের মন্দিরে নতশির হয়। শহরময় কলরব, উৎসব, কোলাহল, ব্যস্ততা। এসবের কেন্দ্র যিনি তিনি নির্বিকার। যুগ যুগ ধরে কোন কলরব তার মৌন শান্তভাব ভঙ্গ করতে পারেনি। রাজবাড়ির ভিতরে শিউলি ও বেলগাছের ছায়ায় লক্ষীনারায়ণ জিউ এর ও আদি শঙ্করাচার্যের মন্দিরে এরমই পরম শান্তি বিরাজ করে। সর্বত্র বিরাজমান ঈশ্বের অস্তিত্বের প্রকাশ এই দুটো মন্দিরে আমি বিশেষ ভাবে অনুভব করেছি। সারাবছর তারকনাথ মন্দিরে সন্ধ্যা আরতির পর যখন হরিনাম সংকীর্তন হয় মনে হয় যেন পরম আনন্দ বিরাজ করে... যেন ঈশ্বরের করুণা ও পরম মমতা কান দিয়ে হৃদয়ে পৌঁছে তা পুলকিত করছে।

মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। আমাদের আদিবাড়িটা মন্দিরের খুব কাছে। ভোরবেলায় বাবার মন্দিরের গেট খোলার আগেই ঠাকুমার হাত ধরে মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতাম। গেট খুলতেই তাড়াতাড়ি বাবার দরজার চৌকাঠে প্রণাম করে পাশে অপেক্ষা করা... দরজা খুলবে বাবা তারকনাথের দর্শন লাভ করা। মন ভালো করা অনুভূতি। তখন ঘাটে যাবার দিকটায় মন্দিরের ছাদের কড়িকাঠে প্রচুর ঘোলা পায়রা থাকত। বিকেলের দিকটায় কোন কোনদিন ঠাকুমা আমাকে নিয়ে রাজবাড়ির ভিতরে মন্দিরের চাতালটায় নিয়ে গিয়ে বসে থাকত। রাজবাড়ির খিলানের ধারে ধারে কত টিয়াপাখি আর পায়রার ভিড় লেগে থাকত। বসে বসে দেখতাম। ঠাকুমা ঠাকুর-দেবতা, রাজবাড়ি, মন্দির নিয়ে গল্প বলত, সেসব শুনে কল্পনায় বিভোর ছোটবেলা কেটেছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসের সংস্কার তাঁর থেকেই পাওয়া।
বড় হয়ে আজ যখন তারকেশ্বরের বাইরে থাকি, জন্মস্থানের প্রতি টনটনে টান আরো বেশি করে অনুভব করি। শ্রাবণীমেলার ভিড়, মন্দিরের ঐ বিশেষ অনুভূতিটা পেতে যেন ছটফট করি। তারকেশ্বরের প্রতিটা রাস্তা, বাড়ি, মানুষজন যেন পরম আত্মীয়ের মত মনে হয়। আমার জন্মস্থান চিরদিন সেরা। সেরা ছিল, আছে ও থাকবে।



উপনিষদের কথা: মুক্তিলাভের উপায়

সাধারণ মানুষ কামনার বশবর্তী হয়ে থাকেন। ধর্ম, অর্থ ও কাম এই ত্রিবিধ পুরুষার্থ চরিতার্থ করাতেই জীবনের সার্থকতা বলে মনে করে থাকেন। কিন্তু এমন মানুষও আছেন যাঁরা এই ত্রিবিধ পুরুষার্থে সন্তুষ্ট হন না। কারণ এই ত্রিবিধ পুরুষার্থের দ্বারা দুঃখের কবল থেকে নিবৃত্ত হওয়া যায় না। সেইজন্য মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে- এমন কি উপায় আছে যার দ্বারা দুঃখের কবল থেকে সম্পূর্ণ নিবৃত্তি লাভ সম্ভব? দুঃখের কবল থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে গেলে সংসার বন্ধন থেকে ও কর্মের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত হতে হবে।

বৃহদারণ্যক উপনিষদের চতুর্থ অধ্যায়ের চতুর্থ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে, পুরুষের হৃদয়ে যে কামনাগুলি আছে সেই কামনাগুলি যখন সমূলে বিনষ্ট হয়ে যায় তখন মরণশীল মানুষ মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারেন। তখন মানুষ এই দেহে ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন। তিনি তখন আত্মাকে জেনে গেছেন বলে দেহের প্রতি তাঁর কোন আসক্তি থাকে না। যেমন সর্পের নির্মোকটি প্রাণহীন বলে সর্প তাহা সহজেই পরিত্যাগ করে থাকে, সেইরূপ ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি সহজেই দেহাভিমান পরিত্যাগ করেন। যিনি আত্মাকে জেনেছেন তিনি মুক্তিলাভ করেছেন। কিন্তু আত্মাকে জানা সহজসাধ্য নয়। আত্মাকে জানবার পথটি অত্যন্ত দুরুহ ও সূক্ষ্ম। এই আত্মজ্ঞানমার্গ যাঁকে স্পর্শ করেছে তিনিই ব্রহ্মবিদ্যা জেনেছেন ও ব্রহ্মবিদ্যার ফলে মুক্তি পেয়েছেন।

কি উপায়ে ব্রহ্মদর্শন সম্ভব তা বলা হচ্ছে- 'মনসৈবানুদ্রষ্টব্যম্' (৪।৪।১৯) অর্থাৎ মনের দ্বারাই ব্রহ্মকে জানতে হবে। সেই মন আচার্যের উপদেশে গ্লানিমুক্ত ও পরিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। সেই পরিশুদ্ধ মনের দ্বারা যথার্থ জ্ঞানের স্ফূরণ হলে যখন ব্রহ্ম সাক্ষাৎ ঘটে তখন ব্রহ্ম আর জ্ঞানের বিষয় হন না, তিনি জ্ঞাতার স্বরূপ হয়ে যান। এক ও অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম ব্যতীত যখন দ্বিতীয় কিছুরই অস্তিত্ব নেই তখন আত্মা প্রমেয় হতে পারেন না। যা প্রমেয় তাহাই জ্ঞেয়। এইজন্য আত্মা অপ্রমেয় বলে অজ্ঞেয়। তাঁহাকে জানা যায় না, যখন দ্বিতীয় বস্তুর অস্তিত্ব নেই তখন কিসের দ্বারা কে কাকে দেখবে? 'কেন কং পশ্যেৎ'? এইরূপ প্রতিষেধমূলক শ্রুতিবাক্য থেকেই ব্রহ্মস্বরূপ অবগত হওয়া যায়। শাস্ত্রজ্ঞানের দ্বারাই দেহাদিতে আত্মজ্ঞানের নিবৃত্তি ও জীবাত্মার পরমাত্মভাবের প্রাপ্তি সম্ভব হয়। আগম বা শাস্ত্রপ্রমাণ ব্যতীতই অন্যান্য বস্তুর প্রমেয়ত্ব সিদ্ধ হয়। কিন্তু শাস্ত্রপ্রমাণ ব্যতীত ব্রহ্মের প্রমেয়ত্ব সিদ্ধ হয় না। ব্রহ্মকে যে অপ্রমেয় বলা হয়েছে তার কারণ ব্রহ্ম প্রমাণান্তরের দ্বারা সিদ্ধ নন।

অভিধান, অভিধেয়ভাবে ব্রহ্মকে প্রতিপাদন করা যাবে না এবং বাচ্যবাচক সম্বন্ধ দ্বারাও ব্রহ্মকে প্রতিপাদন করা যাবে না। আগম বা শাস্ত্র, স্বর্গের বা মেরুপ্রদেশের যে বর্ণনা করে থাকে, ব্রহ্মের সেরকম বর্ণনা করতে পারে না। কারণ ব্রহ্মতত্ত্ব বা আত্মতত্ত্ব হচ্ছে প্রতিপাদকের আত্মস্বরূপ। প্রতিপাদক ব্যতীত দ্বিতীয় বস্তু না থাকায় প্রতিপাদক কাকে প্রতিপাদন করবে? যদি প্রতিপাদক ও প্রতিপাদ্য বিষয় আলাদা হয় তাহলে প্রতিপাদন সম্ভব। কিন্তু এখানে তা এক হয়ে যাওয়ায় প্রতিপাদন করা সম্ভব হয় না।

ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞান বলতে আত্মা ব্যতীত অন্য বস্তুতে যে আত্মবুদ্ধি, তার নিবৃত্তি বোঝায়। সাক্ষাৎ সম্বন্ধে ব্রহ্মে আত্মভাব স্থাপন করা যায় না। কারণ আত্মভাব তো ব্রহ্মে বিদ্যমানই রয়েছে। ব্রহ্মে নিত্যই আত্মভাব থাকলেও অব্রহ্মবিষয়ে আত্মভাবের প্রতীতি হয়। অতএব অব্রহ্মবিষয়ে যে আত্মার আরোপ তার নিবৃত্তি ব্যতীত ব্রহ্মবিষয়ে আত্মভাব হতে পারে না। অব্রহ্ম অর্থাৎ দেহাদিতে আত্মভাব নিবৃত্ত হলে প্রকৃত আত্মভাবের স্ফূরণ হয়।

ধীর, অবিচলিত ব্যক্তি ব্রহ্মজিজ্ঞাসু হয়ে শাস্ত্র নির্দেশিত উপদেশ ও আচার্যের উপদেশ অনুসারে এরূপ প্রজ্ঞালাভ করবেন যার দ্বারা আত্মবিষয়ে আর কোন প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না। এই প্রজ্ঞার সাধনরূপে সন্ন্যাস, শম, দম, উপরতি,  তিতিক্ষা, সমাধান, শ্রদ্ধা প্রভৃতির অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। ব্রহ্মজিজ্ঞাসু বহু শব্দের অনুধ্যান করবেন না। বহুশব্দের প্রতিষেধের দ্বারা একত্বপ্রতিপাদক অল্প শব্দের অনুধ্যান করবার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আর্থবর্নীয় মুণ্ডক উপনিষদেও বলা হয়েছে- 'ওঁ মিত্যেবং ধ্যায়থ আত্মানম্' অর্থাৎ 'ওঁম্' এই প্রকারেই আত্মাকে ধ্যান করবে। 'অন্যা বাচো বিমুঞ্চথ' অর্থাৎ আত্মজ্ঞানের বিরোধী কথা পরিত্যাগ করবে। ব্রহ্মের স্বরূপ অপরোক্ষরূপে উপলব্ধি করতে হলে একমাত্র ' ওঁম্' এই শব্দের দ্বারাই তাঁকে ধ্যান করতে হবে।

ব্রহ্মজিজ্ঞাসুগণ বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ' দান ও কামনাবর্জিত তপস্যার দ্বারা আত্মাকে জানতে ইচ্ছা করেন। সেইরূপ পরমাত্মাকে জেনে তাঁরা জীবন্মুক্ত হন।

সন্ন্যাসীগণ এইরূপ পরমাত্মাকে জানতে ইচ্ছা করে গৃহ পরিত্যাগ করে থাকেন। পুত্র, বিত্ত ও স্বর্গকামনার দ্বারা কি হবে? এইরূপ মনে করে প্রাচীন ব্রহ্মজ্ঞগণ পুত্র, বিত্ত, স্বর্গাদিলোক অবশ্যই কামনা করেন না। এইজন্য তাঁরা পুত্রকামনা, বিত্তকামনা ও স্বর্গাদিকামনা থেকে বিরত হয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন।

বৃহদারণ্যক উপনিষদের শাস্ত্রপ্রধান মধুব্রাহ্মণে  অমৃতলাভের উপায় স্বরূপ সন্ন্যাসপূর্বক সেই আত্মতত্ত্বই যুক্তির দ্বারা প্রতিপন্ন করা হয়েছে। কারণ যাজ্ঞবল্ক্যীয় কান্ড তর্কপ্রধান। অতএব শাস্ত্র এবং তর্কের দ্বারা ইহাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে সন্ন্যাস গ্রহণ পূর্বক আত্মতত্ত্বজ্ঞানই অমৃতলাভের উপায়।

বৃহদারণ্যক উপনিষদের চতুর্থ অধ্যায়ের পঞ্চম ব্রাহ্মণে সন্ন্যাস গ্রহণের পূর্বে যখন যাজ্ঞবল্ক্য তাঁহার অন্যতমা স্ত্রী মৈত্রেয়ীকে ধনবিভাগ করে দিতে চাইলেন, তখন মৈত্রেয়ী বলছেন- 'যেনাহং নামৃতস স্যাম্ কিমহং তেন কুর্য্যাম্'? অর্থাৎ যে ধনের দ্বারা আমি অমৃতত্ত্বলাভ করতে পারব না সেই ধনের দ্বারা আমি কি করব? মৈত্রেয়ী ছিলেন ব্রহ্মবাদিনী। তিনি স্ত্রীজনোচিতজ্ঞানযুক্তা ছিলেন না, তাঁর শাস্ত্রজ্ঞান ছিল প্রগাঢ়। ব্রহ্মতত্ত্বই ছিল তাঁর আলোচনার প্রধান বিষয়। কিভাবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করা যায় তাই ছিল তাঁর একমাত্র চিন্তা। যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন- প্রথমে আচার্যের বাক্য ও শাস্ত্রবাক্য হইতে আত্মতত্ত্ব শ্রবণ করবে, ''শ্রোতব্যঃ শ্রুতিবাক্যেভ্যঃ-'' অর্থাৎ শ্রুতিবাক্য হইতে শ্রবণ করবে। আত্মাকে দর্শণ করার পূর্বে আত্মবিষয়ক পরোক্ষ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শ্রুতিবাক্য থেকে আত্মবিষয়ে শ্রবণের ফলেই পরোক্ষ জ্ঞান হয়। ''শ্রবণং নাম কেবলম্। উপক্রমাদিভির্লিঙ্গৈঃ শক্তিতাৎপর্যনির্ণয়ঃ''॥ (বিবরণ প্রমেয় সংগ্রহ)

নির্বিশেষ ব্রহ্ম প্রতিপাদনেই যে বেদের তাৎপর্য তা তাৎপর্য নির্ণায়ক ছয়টি লিঙ্গের দ্বারা অবগত হওয়া যায়।
''উপক্রমোপসংহারাবভ্যাসোহপূর্বতাফলম্।
অর্থবাদোপপত্তী চ লিঙ্গং তাৎপর্যনিশ্চয়ে॥'' (বৈয়াসিক ন্যায়মালা)

ছয়টি লিঙ্গ হল- (১) উপক্রম ও উপসংহার, (২) অভ্যাস, (৩) অপূর্বতা, (৪) ফল, (৫) অর্থবাদ, (৬) উৎপত্তি। উপক্রম বলতে আরম্ভ বোঝায় ও উপসংহার বলতে শেষ বোঝায়।

ছান্দোগ্য উপনিষদের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ''সদেব সোম্যেদমগ্র আসীৎ'' ইত্যাদি বাক্যের দ্বারা আরম্ভ করে ''ঐতদাত্ম্যমিদং সর্বং তং সত্যম্'' ''স আত্মা তত্ত্বমসি'' এইরূপ বাক্যের দ্বারা উপসংহার করা হয়েছে। উপক্রমে যে কথা বলা হয়েছে, উপসংহারেও তারই পুনরুক্তি করা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে যে নির্বিশেষ ব্রহ্ম প্রতিপাদনেই উপনিষদের তাৎপর্য।

দ্বিতীয় লিঙ্গ হল অভ্যাস। অভ্যাস শব্দের অর্থ বারে বারে একই কথা বলা। যে বিষয়টি বার বার বলা হয় সেই বিষয়টির তাৎপর্য থাকে। ছান্দোগ্য উপনিষদে 'তত্ত্বমসি' কথাটি নয় বার বলা হয়েছে। এখানে তৎ ও ত্বম্ পদের দ্বারা ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের অভিন্নতাই উপদিষ্ট হয়েছে। অতএব বহুবার একই কথা বলায় উপনিষদ যে ব্রহ্মপ্রতিপাদক তা জানা যায়।

তৃতীয় লিঙ্গ হল অপূর্বতা। যাহা অন্য প্রমাণের দ্বারা অবগত হওয়া যায় না, কিন্তু একমাত্র শাস্ত্রপ্রমাণের দ্বারাই জানা যায়, তাহাই সেই বিষয়টির অপূর্বতা- 'মানান্তরাগম্যত্বমপূর্বত্বম্' (বৈয়াসিক ন্যায়মালা)। প্রতক্ষ্য, অনুমান, উপমান, কিংবা অর্থাপত্তি এই প্রমাণগুলির কোনটির সাহায্যেই ব্রহ্মকে প্রতিপাদন করা যায় না। অতএব ব্রহ্মের স্বরূপ নিরুপণের জন্য শাস্ত্রবাক্যই প্রমাণরূপে অবলম্বনীয়। অতএব তৃতীয় লিঙ্গের দ্বারাও নির্বিশেষ ব্রহ্মই প্রতিপাদিত হয়েছে।

চতুর্থ লিঙ্গ হল ফল। প্রতিপাদ্যবিষয়টির প্রয়োজন-নির্দেশ। ''একবিজ্ঞানেন সর্ববিজ্ঞানং ফলম্''- (বৈয়াসিক ন্যায়মালা) অর্থাৎ একটি বিষয়ের জ্ঞানের দ্বারা সকল বিষয়ের জ্ঞান হওয়াকেই ফল বলে। যেমন মৃত্তিকারূপ কারণকে জানলে ঘটপটাদিরূপ কার্যকে জানা যায়, সেইরূপ আলোচ্যস্থলে এক ব্রহ্মকে জানলে জাগতিক সকল বস্তুকেই জানা যায়। শ্রুতির বক্তব্য অনুসারে, ব্রহ্মভাব প্রাপ্তিই জ্ঞানের ফল।

পঞ্চম লিঙ্গ হল অর্থবাদ। প্রশংসাসূচক বাক্যকেই অর্থবাদ বাক্য বলা হয়। যা প্রতিপাদিত হয়েছে তৎসম্বন্ধে কিছু বলার নামই অর্থবাদ। ব্রহ্মই জগতের কারণ এইরূপ বলার পরও 'ইহা হতে এই জগতের উৎপত্তি, ইহাতেই স্থিতি ও লয় হচ্ছে, ইহাতেই জীব সকল প্রবেশ করছে, ইহার শাসনেই জীবসকল নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে' - এইরূপ যে সকল শ্রুতিবাক্য আছে তাকে অর্থবাদ বলা হয়। এই সকল অর্থবাদ বাক্যের দ্বারা জানা যায় নির্বিশেষ ব্রহ্মই জগতের কারণ।

ষষ্ঠ লিঙ্গ হল উপপত্তি। উপপত্তি শব্দটির অর্থ যুক্তি। দৃষ্টান্তের দ্বারা যখন দার্ষ্টান্তিককে স্থাপন করা হয় তখন ঐ দৃষ্টান্তকেই যুক্তি বলা যেতে পারে। যেমন ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হয়েছে- একটি মৃত্তিকাপিণ্ডের দ্বারা মৃত্তিকার পরিণামভূত ঘটাদির জ্ঞান হয় সেইরূপ বিকারস্বরূপ অনন্তবৈচিত্রযুক্ত এই জগতের কারণস্বরূপ যে নির্বিশেষ ব্রহ্ম, তিনিই একমাত্র সত্য বস্তু। এইভাবে ষষ্ঠলিঙ্গরূপ যুক্তির দ্বারা অনন্তবৈচিত্রযুক্ত জগতের মিথ্যাত্ব এবং নির্বিশেষ ব্রহ্মেরই সত্যত্ব প্রতিপাদিত হয়েছে।

যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন- অমৃতলাভের উপায় হল বৈরাগ্য অর্থাৎ বিষয়ে অনাসক্তি। সন্ন্যাসগ্রহণ করতে হলে স্ত্রীপুত্রাদির প্রতি বৈরাগ্য উৎপন্ন করতে হবে। আত্মতত্ত্ব পুত্রের হতে প্রিয়তর, ধনসম্পদ হতে প্রিয়তর এবং সকল বস্তু হতে প্রিয়তর।

অতএব আত্মাই দ্রষ্টব্য অর্থাৎ দর্শনের যোগ্য। প্রথমে আচার্যের কাছ থেকে এবং শাস্ত্রপাঠ থেকে আত্মতত্ত্ব শুনতে হবে। পরে তর্কের সাহায্যে তা বিচার করতে হবে। 'মন্তব্যশ্চোপপত্তিভিঃ'- অর্থাৎ যুক্তিসমুহের দ্বারা শ্রুতিবাক্যের মনন করতে হবে।
''সর্ভেদান্তবাক্যানামাচার্যমুখতঃ প্রিয়াৎ।
বাক্যানুগ্রাহকন্যায়শীলনং মননং ভবেৎ''॥ (বিবরণ প্রমেয় সংগ্রহ)
অর্থাৎ প্রিয় আচার্যের মুখ থেকে বেদান্তবাক্যের ব্রহ্মবিষয়ে তাৎপর্যজ্ঞানের অনুকূল যুক্তি শ্রবণ করে সেইসকল যুক্তির পুনঃ পুনঃ যে অনুশীলন তাকেই মনন বলে।

মনন করে পরে সেই আত্মার নিরন্তর ধ্যান করাকে নিদিধ্যাসন বলে- ''মত্বা চ সততং ধ্যেয়ঃ''। ''নিদিধ্যাসন মৈকাগ্র্যং শ্রবণে মননেহপি চ''- অর্থাৎ বেদান্তবাক্যের শ্রবণে ও মননে চিত্তের যে একাগ্রতা তাই নিদিধ্যাসন। শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের সাহায্যেই আত্মদর্শন হয়ে থাকে॥

কামনা

আমার নিমগ্ন নির্জনে আকন্ঠ পিপাসা।
হে চিরপুরুষ তোমায় আত্মার অনুভূতিতে পেতে
আমার অন্তরের প্রলয়,
মৃত্যুর শান্তিরূপ নিয়েছে।
তোমাকে পাওয়ার আজন্ম শপথে, আর আশা- নিরাশার খেলায় প্রতীক্ষারতা আমি প্রকৃতিস্বরূপা॥

বেসরকারী কর্মচারী

কেউ বোঝেনা কতটা কষ্টে আছি আমি।
রোজ সকালে সাফল্যের ব্যর্থ দৌড়-এ 
ট্রেনের ভিড় কামরায় ঘুমিয়ে পড়ি আমি।
রোজনামচা আত্মহত্যার ইচ্ছা 
বাড়ি ফিরে বাতিল করি আমি।
গলার ভিতর দলা পাকানো অপমানের বোঝা,
ক্যালেন্ডারের পাতায় মাস ফুরানোর চিন্তা,
কেমন যেন হাসতে ভুলেছি আমি।
বাঁচতে চাই আমি।
বাঁচতে চাই আমি।
তাই ঘুরে দাঁড়াব, ফিরে তাকাব।
প্রখর রোদে হেঁটে বেরাব।
আবার ফিরব আমি।
আমি কর্মচারী, খাটতে জানি, 
হারতে শিখিনি আমি॥

অনুচ্চারিত

জানি আমি,
রোজ আমার সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু আমি বাঁচতে চেয়েছি প্রাণভরে।

তাই অপ্রকাশিত পান্ডুলিপির পাতায় 
লিখে যেতে চাই -
গিটারের সুরে বাঁধা কবিতা। 

আমার বুক কখনো পায়নি কোন শান্ত্বনা,
বিনিদ্র রাত্রে শয্যাসঙ্গী শুধু যন্ত্রনা।
যেদিন মুক্ত হবে নিষেধের বাঁধন, 

সেদিন পাখি হব, কখনো ধরা দেবোনা॥

কল্পনা

এইরকমই বর্ষার রাতে তোমার ছবি ভেসে আসে মনে,
কালো মেঘ আরো ঘন হয়ে আসে আশেপাশে।
বৃষ্টির শব্দ, ঝড়ের তান্ডব আর মাটির ভেজা গন্ধে অনুভব করছি তোমাকে।
কালো আকাশের বুক চিরে বজ্রের মতো
মনে জ্বলে উঠছে তোমার স্মৃতি।

জানালা দিয়ে চোখ চলে যায়
ঘন কালো আকাশের দিকে-
যেন তোমার আধবোজা চোখের মতো,
তাকালেই নেশা লেগে যায়।
তোমার স্পর্শে এখনো ভিজে আছে 
হৃদয়ের স্পর্শ, মনের কল্পনা।
আজ এই ভেজা রাতে এসো তুমি,
মিশে যাক বাস্তবে কল্পনা, দূর হোক ভিন্নতা-

আজ এসেছে বর্ষা, প্রেমের বৃষ্টিতে অবগাহনের কাল॥


মানুষ

যে মানুষটা ভোর থেকে খুঁজে ফেরে শহরের জঞ্জাল
এই যান্ত্রিক যুগে-
তাকে দেখা যায় ভিড়ময় ট্রেনের কামরায় গান গেয়ে ভিক্ষা চাইতে।
কখনো তাকে দেখি দুর্গন্ধময় ম্যানহোল পরিষ্কার রত মুদ্রায়।
তাকে দেখে প্রতিবার স্যুট-বুটের 'সভ্যতা' চোখ ফিরিয়ে নেয়, মুখে রুমাল চেপে ধরে।

সরল শিশুর প্রশ্ন- 'ও কে মা?'
সাবধানী মা চেনাতে অস্বীকার করে অর্ধনগ্ন গরীব মানুষকে। 
তাকে চিনতে নেই, তফাৎ রাখতে হয়- এই যেন সভ্যতার অহঙ্কারী মুখোশ!

তখন ভিড়ময় কামরায় বা রাস্তায় চলাফেরায় 
সভ্য সাধুর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে 
অমানবিক ভন্ডামির কালো চেহারাটা।
যা জঞ্জালমাখা মানুষটার থেকে বেশি দুর্গন্ধময়, 
যা সুগন্ধী ঢাকতে পারে না।
তখন জানা যায় শাক ঢাকা আসলে রাশি রাশি মাছ।

যেদিন ঈশ্বরের করুণাদৃষ্টি ঝরে পড়বে এই মানুষটার প্রতি-
সেদিন রসাতলে যাবে সভ্যতা, বর্বরতা আর ফিরে আসবে মানবতা।
আসুক সেই দিন, মহাপ্লাবনে ধুয়ে মুছে যাক সব বিভেদ।
বিশ্বাস করি গল্পে, মনু আসবে মানবতার নৌকা নিয়ে মানুষটাকে বাঁচাতে॥

ভোর

ভোর ৪ টেয় ঘড়িটা রোজ ঘুম থেকে ডেকে তোলে। আজও তাই। যান্ত্রিক এই কর্তব্যপরায়ণতা দেখে বেশ লাগে। উঠে দেখি জানলার কাচের গায়ে বিন্দু জলের ভিড়। ভোর রাতে বৃষ্টি হয়েছে। জানালা খুলতেই প্রানখোলা হাওয়ায় বুক ভরে গেল। এমন সময় আমি একা জাগ্রত প্রাণী বাড়িতে। ভোরের এই নিস্তব্ধতা আমার খুব প্রিয়। এই সময়টায় মনে হয় একাকীত্ব মন্দ নয়! এরও ছন্দ আছে। বেসিনের কলের জলটা বেশ ঠান্ডা... এই শীতলতার পরশে বার বার আঙুলে লাগা উষ্ণতাকে ভেজাতে ভালো লাগে। নাঃ, এবার রেডি হয়ে বেরোনোর পালা। হাঁটতে বেরোই রোজ। 

পাড়ার রাস্তা দিয়ে বেড়িয়ে বড়  রাস্তা ধরে রোজ হাঁটা। এই ব্যস্ত রাস্তাটাও এই সময় শান্ত, চুপচাপ, ঘুমন্ত থাকে। দোকানের ঝাঁপগুলো বন্ধ, পাড়ার সহবাসিন্দা কুকুরগুলো ধুলোমেখে সাংসারিক ঘুমে নিমগ্ন। গ্রাম থেকে সাইকেলে হাঁড়ি বসিয়ে মাছ নিয়ে বাজারের দিকে চলন্ত জেলে, আমার মত হাঁটতে বেরোনো কিছু পথচারী ছাড়া পথ ফাঁকা। মোড়ের মাথায় স্বপনদার চায়ের দোকানটা খুব ভোরে খুলে যায় রোজ। সেখানে কয়েক জনের চা পান করে চাঙ্গা হবার ভিড়। 
এক ঝাঁক কালো পায়রা রাস্তার মাঝে দুলে দুলে হাঁটছে। বকম্ বকম্ শব্দে ভোরটা ভরিয়ে রেখেছে। রাস্তায় ভিড় বাড়ছে এবার। কাগজ দেয় যে ছেলেগুলো... সব মুখচেনা... দেখা হয়... 'গুডমর্নিং দিদি' বলতে বলতে  চলন্ত সাইকেল নিয়ে যায়... তারা এই ভোরে রোজ সবার বাড়ি খবর দেবার জন্য আমার ঘড়িটার মতো যান্ত্রিক কর্তব্য করে চলে... সব ঋতুতে। এদের প্রতি সম্মানে মনটা ভালোলাগায় ভরে যায়।  


রেলগেটের কাছে যখন আসি তখন ৫ টা বেজে যায়। দেখি তেলেভাজার দোকানে উনুনে আঁচ দিয়েছে। আরো একটু এগিয়ে কালীমন্দিরের সামনে প্রণাম করে ঘরে ফেরার পালা।
ফেরার পথে একমুঠো পুজোর ফুল তুলি বড় পুকুরের ধার থেকে। টগর আর আকন্দ। দেখি সোনালি আভায় পুকুরের টলটলে জলে আকাশের ছবি। এই পুকুর ঘাটে এখনো কত মহিলা এই ভোরে স্নানে আসেন। তাদের হাসি-গল্পে ঘাটের সিঁড়িগুলো ডুবে থাকে। 

পাড়াটা জাগছে। নতুন হওয়া ফ্যাটগুলোর কোন কোন ব্যালকনিতে লেগে থাকা সংসার দেখতে পাওয়া যায়। অচেনা মানুষ সব। সবাই জাগছে। সবার সকাল হচ্ছে। এভাবে রোজ সকাল আসুক, নতুন আলো নিয়ে... আনমনে বলি রোজ। এই শান্তির অনুভবে মানুষ হিংসা ভুলে বাঁচতে শিখুক। দিন শুরু হোক।

আবদার

সারাদিন মেঘলা,
একলা কাটে আমার বেলা।
চলে এসো আমার কাছে
গাইব গান সুর মিলিয়ে।
আমার বেলা
হাসি - খেলা
আসবে আবার পরশে তোমার।
গাইব যে গান বাতাস সুরে
পাখির কুজন আর বারি- তালে
শোনাবে তা বিশ্বকে
তোমার আমার প্রাণের টান।
মাটির গন্ধে মন মাতিয়ে
হালকা হাওয়ায় প্রাণ দুলিয়ে
বারিধারায় ভিজব দু'জন।
সৃষ্টি হবে নতুন করে
তোমার আমার প্রাণের ভুবন॥

শিবরাত্রি- অনুভবে বুঝি তুমি আছো


ভোর ৪:৩০। সবে অ্যালার্মের আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। চাদরের উষ্ণতা তখনও গালে, কানের পাতায়, হাতের তালুতে... কাঁচের জানালার বাইরে টুপ্ টুপ্ শব্দ। বৃষ্টি হচ্ছে নাকি?! মেঝেতে পা ফেলতেই ঠান্ডা অনুভবটা আমার বেশ প্রিয়। ধীর পায়ে উঠে বারান্দার দরজাটা খুলতেই একরাশ ঠান্ডা হাওয়ার পরশ বুক ভরিয়ে দিল! দেখি কুয়াশার চাদরে আমাদের পাড়াটা ঢেকে আছে। সামনের আমগাছটায় চুঁয়ে যাওয়া বকুল থেকে টুপ্ টুপ্ করে কুয়াশা গলে পড়ছে। গাছের ডালে মাকড়শার জালগুলো ফোঁটা ফোঁটা জলে সাদা হয়ে আছে। রাস্তায় রাতবাতিগুলো জ্বলছে, পাশেই বন্ধ দোকানের সামনে লালি তার চারটে পুচকে কে আগলে ঘুমোচ্ছে, চারদিক শান্ত, নিস্তব্ধ, স্নিগ্ধ, শীতল।  এরমই শান্ত-শীতলতার খোঁজে যুগ যুগ ধরে মানুষ সংসার ত্যাগ করেছে, কত পথ পাড়ি দিয়েছে, কত গুহা-অরণ্যকে তপোভূমিতে উৎকর্ষিত করেছে! মনে পড়ল আজ শিবরাত্রি। তারকনাথের খোলামূর্তির স্নিগ্ধতাটা মনে পড়ল। দুটো হাত আপনি প্রণাম মুদ্রায় কপাল ছুঁলো। আজ এভাবে আমার দিন শুরু হল...।

The Self

Yajnavalkya said to his wife Maitreyi," Oh. Maitreyi, it is true that it is not for the sake of the husband. that he is loved but for one's own sake that he is loved. It is not for the sake of wife that she is loved but for one's own sake that she is loved. It is not for the sake of the sons that they are loved but for one's own sake that they are loved. It is not for the sake of welth that it is loved but for one's own sake that it is loved. It is not for the sake of the animals that they are loved but for one's own sake that they are loved. It is not for the sake of worlds that they are loved but for one's own sake that they are loved. It is not for the sake of the Gods that they are loved but for one's own sake that they are loved. It is not for the beings that they are loved but for one's own sake that they are loved. It is not for the sake of all that all is loved but for one's own sake that all is loved. Oh Maitreyi, the Self is to be realised, heard of, established by argument and meditated upon. The Self being realised, heard of, established by argument and meditated uopn, all is known.
- From Brihadaranyaka Upanisada (4|5|6).

ভোটের গল্প


ছোটবেলায় দেখতাম বিকেলের দিকে মিছিল বেরোতো। সামনে একটা টলি (ভ্যান গাড়ি)-তে একটা মাইক বাঁধা আর পিছনে অনেক লোকের দল; সামনের দিকে এমনি হাঁটা, আর পিছনের দিকের লোকগুলো সাইকেলগুলো হাতে ধরে হেঁটে হেঁটে যেত আর... সমস্বরে 'ইনক্লাব জিনাব্বাদ'(তখন সঠিক শব্দটা বা উচ্চারণ জানতাম না এটাই বুঝতাম); 'মানছি না মানব না', 'আমাদের দাবি মানতে হবে'। আবার 'বন্দেমাতরম্'।
দূর থেকে মিছিল আসছে শুনলেই একছুটে আমাদের দোকান ধারে বা সদর চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়াতাম। মিছিল আসছে! দেখব! কি ভালো লাগত! পাড়ার চেনা কাকারা হাসিমুখে দেখে ঘাড় নাড়ত! বেশ মজা হত। মিছিল চলে যাবার পর খেলতে খেলতে ওই শ্লোগানগুলো ওইরকমই সুরে বলে বলে খেলতাম। 'ভোটে যে দাঁড়াত' সে আমাদের বাড়ি ভোট চাইতে আসতই... কারণ আমাদের বাড়িতেই এক ডজন ভোটার। এসে ঠাকুমাকে প্রণাম করত। দেখতাম। প্রতিবার ভোটের এক হপ্তা আগে ঠাকুমা ভোট নিয়ে চিন্তা করত। 'ব্যালট কাগজে ভোটের স্ট্যাম্প দিলেই তো হল না, ঠিক মতো না মুড়তে পারলেই তো ল্যাপ্স হয়ে যাবে'। তখন কাকারা বোঝাত। রোজ পড়ন্ত দুপুর পাড়ার সব ঠাকুমাগুলো আমাদের বাড়ি জড়ো হত। বেলপুকুর পাড়ে বাগানের পাশে নতুন ঘরের চাতালটায় মাদুর পেতে বসে সব ঠাকুমারা গল্প করত। ভোটের কদিন আগে থেকে এই 'ব্যালট কাগজে স্ট্যাম্প' দেওয়া নিয়েই সবার চিন্তা আর আলোচনা চলত। ভোটের দিন ঠাকুমা, মা, মেজমা, পিসিরা কি সুন্দর মাড়ভাঙা কাপড় পরে ভোট দিতে যেত। আর ভোটের দিন মানেই সকালের জলখাবারে লুচি-আলুরদম আর মিহিদানা আর দুপুরে খাসির মাংস। এ একেবারে অলিখিত নিয়ম ছিল।
তারপর যেবছর ভোটার কার্ডের জন্য ছবি তুলতে যেতে হল সে তো যেন উৎসব! ধনিয়াখালি থেকে অনিল দাদু বলে একজন পুটলি মাথায় করে তাঁতের শাড়ি এনে আমাদের পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাড়ি বিক্রি করত। সন্ধ্যেবেলা অনিল দাদু এলে আমাদের বাড়ির দালানে মা, মেজমা, ছোট পিসি, ঠাকুমা সবাই গোল করে মাদুরে বসত শাড়ি পছন্দ করতে। সেবার ভোটার কার্ডের জন্য ছবি তুলবে বলেও নতুন শাড়ি কেনা হল সবার। তারপর সকাল থেকে হাইস্কুলে গিয়ে ছবি তোলার জন্য সে কি উন্মাদনা, কত আনন্দ, কত উত্তেজনা, কত হাসি মুখ! কিন্তু যখন ভোটার কার্ড গুলো এলো সে কি হাসাহাসি! কাউকে চেনার উপায় নেই! তখনও বেশ ক'দিন এই নিয়েই ইয়ার্কি-হাসাহাসি চলেছিল!

ভোট এলেই কেমন একটা খুশির ব্যাপার হয় তারকেশ্বরে। বড় হয়েও দেখছি এই আনন্দটা এখনও একই আছে। সাজগোজ করে সকাল সকাল ভোট দিতে যাওয়া, ভোটের ছুটিতে দুপুর বেলা জমিয়ে খাওয়াদাওয়া... বিকেলের দিকে টিভিতে শুধুই খবরের চ্যানেল...সেই একই আছে।
এরমই থাকুক। সবাই ভালো থাকুন। ভোট দিন।

স্বীকারোক্তি


শব্দময় শহর থেকে দূরে
নিঝুম কাঁকুড়ে গ্রাম্যপথের বাঁকে
একলা হাঁটছি, ধীর পায়ে।
এ মেঠো রাস্তা পড়ে আছে অন্ধকার মেখে
আকাশের নীচে, একাকি আমার মতো।
মাথার উপরে আলোকবর্ষ দূরে তারাদের হাতছানি,
গ্রাম্যরমণীর বাজানো শঙ্খধ্বণি,
নদীর ওপারের স্বপ্ন দেখায়।
মেঠোপথের ধারের বনফুলের সুগন্ধের আবেশ
একাকিত্বে মাখামাখি।
এ ঐশ্বর্য্য জানে শুধু জোনাকির আলো।
আনমনে হাঁটছি অনেকক্ষণ,
পিছনে ফেলে এসেছি অনেক সাদা-কালো দৃশ্য।
এখন সামনে অনেক পথ বাকি।
একলা হাঁটব, ধীর পায়, ধুলোমাখা পায়।
নিঝুম কাঁকুড়ে গ্রাম্য পথে॥

Aham Brahmasmi

''When there is duality one sees something, one smells something, one tastes something, one speaks something, one hears something, one thinks of something, one touches something and one knows something. When everything has become the Self, what is to be seen and by what, what is to be smelt and by what, what is to be tasted and by what, what is to be communicated and by what, what is to be heard and by what, what is to be thought and by what, what is to be touched and by what, what is to be known and by what? What can help one to know the Self by whom the world is known. The Self is described as 'Not this, Not this'. The Self is imperceptible for It is not pereceived. The Self is undecaying for It never decays. The Self is unattached for It never attaches [to the worldly objects]. The Self is confined for It never feels pain and never perishes. Oh Maitreyi! What can help one to know the Self, the knowledge incatnate? Thus you have got instruction. Oh Maitreyi! This is the means of salvation.'' Saying this Yajnavalkya adopted the fourth stage of life. - Brihadaranyaka Upanishada 4/5/15.

মানুষ চেনার উপায়- আমার মত

সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা সুদক্ষ উপায়ে ভদ্রবেশে অন্যের ক্ষতি করে বা অন্যকে সুনিপুনভাবে কষ্ট দেয়, কিংবা যাদের ভালো ব্যবহার আসলে এক কথায় অভিনয়, তাদের আগে থেকে চেনার কোনো উপায় আছে কি? 

আসলে পৃথিবীতে মানুষ চেনা বোধহয় সব থেকে কঠিন কাজ।আমরা যদি ভালো আর খারাপ মানুষের তফাত্‍ টা আমাদের কোন ক্ষতি হওয়ার আগেই বুঝতে পারতাম,তাহলে তো আমাদের কখনও কোন অনিষ্ট হতই না।কিন্তু দুর্ভাগ্য!আমরা দুর্ঘটনা ঘটার পর মানুষকে চিনতে পারি।তবে একটা তো পথ থাকবেই।যেভাবে বলা হয়,অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন একটা না একটা ভুল করেই,ঠিক তেমন কিছু কিছু মানুষের আচরন দেখেই মানুষকে চেনা যায়।বাংলায় একটা প্রবাদ আমরা সবাই জানি যে "অতি ভক্তি চোরের লক্ষন"! ঠিক তেমনই যে আপনার ক্ষতি করতে চায় সে অতি ভালোমানুষী দেখিয়ে আপনাকে ধীরে ধীরে বিপদের পথে নিয়ে যাবে।তারপর সুযোগ বুঝেই বিপদের দিকে ঠেলে দিবে।তাই এইসকল অতি ভালোমানুষীর আচরন করা মানুষ গুলোর থেকে সাবধান থাকা উচিত।নিজের মেধা বুদ্ধি দিয়ে যাচাই করে পথ চললে এদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

অপেক্ষা ও অধরা তুমি


কখনো তুমি চলমান তো কখনোও স্থির ছবি
তোমার স্বত্ত্বা আজও অধরা - অচেনা
মনকেমনের বেলাগুলোতে আমি তোমাতে হারাই
চলমান ছবিতে তোমাকে ছুঁয়ে দেখি
       আঙুলে লেগে যায় চিনচিনে ব্যথা।
যেভাবে আকাশের বুকে লেগে থাকা উড়োজাহাজ
পরবাসী তোমায় পড়ন্ত বিকেলে আকুল করে-
       ঘরে ফেরার ডাক দেয়-।
আরব সাগর পাড়ের হাওয়া তোমার চুল ছুঁয়ে
এই দূর সমতলে আসে কি? -জানি না;
       তবু সে স্পর্শের খোঁজ করি।
আসমুদ্র হিমাচল 'জয়' করে বাড়ি ফিরে দেখো-
তোমার বালিশের পাশে আমার এই কবিতায় মোড়া দাবিহীন অপেক্ষার 
একটা চিঠি রাখা থাকবে-
কবিতার নাম - 'MANNAT'.. 'Land's End'...॥

ছোটবেলার গল্প


তখন বই-য়ের ব্যাগের বোঝায় শিরদাঁড়া নুয়ে যেত না। হুড়োহুড়ি, দাপাদাপি আর দাদুর দোকানের টিকটিকি লজেন্স, ২০ পয়সার লটারী, দাঁতের লড়াই খাওয়া চলত বেহিসাব!

ক্লাস ওয়ান-ফোর কোন বেঞ্চের ব্যবস্থা ছিল না। সবাই মেঝেতে বসতাম। তাড়াতাড়ি স্কুলে গিয়ে রোজ বসার চট নিয়ে টানাটানি, কাড়াকাড়ি চলত। অনেকে বাড়ি থেকে বসার আসন আনত। সেই আসনে যে সে-ই বসতে পারবে এমন কোন গ্যারান্টি থাকত না।

স্কুলের বাড়িটা যখন নতুন করে তৈরি হল কি আনন্দ! সিঁড়ির রেলিং এ বসে গড়ান খেতে খেতে সোজা নেমে পড়ার মজাই ছিল আলাদা। আমাদের হেড স্যার গোবিন্দ ভাণ্ডারী বাবু প্রার্থনার পর ছড়ি নিয়ে রাউন্ড দিতেন তবে সবাই 'কেলাস' এ ঢুকতাম।

দুপুরে টিফিনে এক ছুটে দৌড়ে বাড়িতে ভাত খেতে যেতাম। ভাত খেয়ে এসেই চলত আবার খেলা।
গরমের ছুটি, পুজোর ছুটিতে ৩০-৪০ পাতা হাতের লেখা করতে হত। তখনও খালি খেলা।

স্কুলে মাঝে মাঝে ডাক্তার আসত। রব উঠে যেত ইনজেকশান দেবে। স্যারেদের চোখে ফাঁকি দিয়ে ব্যাগ/বাক্স নিয়ে তখন যে যার বাড়ি পালাতাম।
কতবার যে ছড়ির মার খেয়েছি তা মনে নেই। স্যারেদের থেকে স্নেহ পেয়েছি তার কোটিগুণ।

রোজ টিফিনে খেলার সময় পড়ে গিয়ে হাত-পা ছিঁড়ে গিয়ে গিয়ে হাঁটুগুলোয় ক্ষত হয়ে যেত। স্যার-দিদিমণিরা দেখলেই অফিস রুমে নিয়ে গিয়ে নিজেরা হাতে করে ওষুধ লাগিয়ে দিতেন। তাঁদের আন্তরিকতার কথা মনে পড়লে মনটা ভরে ওঠে।
আমরা আজীবন স্কুলের অফিস রুমের চৌকাঠের বাইরে জুতো খুলে খালি পায়ে অফিস রুমে ঢুকেছি। কেউ কোনদিন জোর করেনি 'এরম করতেই হবে!' তাও করেছি। ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় করেছি।

এত আনন্দের ভিড়ে কখন যে স্যার-দিদিমণিরা পড়া করিয়ে নিতেন বুঝতেই পারতাম না। আজ তাঁদের আশীর্বাদে আমরা সবাই নিজের মতো করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের জীবনের ভিত গড়েছেন তাঁরাই🙏।
সরলতার দিনগুলো তখন পেয়েছিলাম বলেই হয়তো আগামী প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যেতে পারব। আর কিছু না পারলেও বলার জন্য গল্প আছে সেটাই কম কি!
© Subhra Chakraborty

আমি ভালো নেই


'কেমন আছিস?'- এই প্রশ্নের উত্তরে 'মিথ্যা' বলি আমি। যত বয়স বাড়ছে এই মিথ্যাটা সত্যির মতো করে বলতে আরো পারদর্শী করছি নিজেকে।

কেন করছি? - নিজেকে প্রশ্ন করলে উত্তর পাই 'আরে এরমই তো বলতে হয়'! সবাইকে বলতে আছে নাকি কষ্টের কথা? লোকে জেনে যাবে, হাসবে, সমালোচনা করবে! তাই নিজের কষ্ট নিজেকেই দূর করতে হবে। তাহলে জ্ঞান দিই যে - 'আনন্দ ভাগ করলে বাড়ে আর দুঃখ ভাগ করলে কমে'! আরে ওটা তো কেতাবি জ্ঞান! তার সঙ্গে বাস্তব জীবন মেলে নাকি! বাস্তবটা খুব কঠিন!

কে বাস্তবটা কে এরম কঠিন/জটিল করল? আমি- তুমি- প্রত্যেকে। অবিশ্বাস এর কারণ। আমরা পরিবার-বন্ধু-প্রতিবেশী সবাইকে অবিশ্বাস করি। আর অপরপক্ষে প্রত্যেকে প্রত্যেককে। তারা কেউ আমাদের ভালো করবে, ভালো চায় এটা আমরা মানি না যেমন ঠিক তেমনই মানি যে সব্বাই ক্ষতি করবে, খারাপ চায়, হিংসা করে। তাই নিজেকে তাদের তুলনায় একটা উচ্চ আসনে বসিয়ে 'বড়', 'ভালো', 'মহান' করি আর কাছের মানুষজনদের নানা ভাবে সুযোগ পেলেই ছোট করি, জিনিসপত্রের-জ্ঞানের শো-অফ করি, অপমান করি, বিশ্বাসঘাতকতাও করি। কারোর ভালোয় খুশী হই না। এসব করতে গিয়ে আমরা ভালো নেই। কেউ ভালো নেই। নিজের একার ভালো চাইতে গিয়ে এতটা একলা করে ফেলেছি ভিতর থেকে যে এই মূহুর্তে কোন ঈশ্বরিক/প্রাকৃতিক ভাবে আমরা প্রত্যেকে যা যা চাই সেগুলো পেয়ে গেলেই যে আমরা চিরতরে সুখী হব বা ভালো থাকব তার গ্যারেন্টি আমরা নিজেরাই দিতে পারব না।

সব সময় মিথ্যা বলতে বলতে অভিনয় করতে করতে কেমন ভুলেই গেছি আসল সত্যিটা! আসলে ভালো থাকার জন্য কিছুই করছি না। শুধু চোখ বেঁধে অন্ধকারে ছুটছি, যতক্ষণ না ধাক্কা খাচ্ছি সম্বিত ফিরবে না!

এই উপলব্ধিটা প্রকাশ করলাম, ভাগ করে নিলাম সবার সাথে। 'সত্যকে সহজ ভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা' বলতে পারেন।
© Subhra Chakraborty

মনে করছি


যেভাবে অদ্ভুত দৃষ্টি ঢুকে পড়ে মাথার ভেতরে
সীমান্তের কোনও অংশে আচম্বিতে যুদ্ধ লেগে যায়
যেভাবে পাতাল ফুঁড়ে, স্টেশনে হঠাৎ আসে ট্রেন
যেভাবে বৃষ্টির জল নেমে আসে তরুন পাতায়

যেভাবে চোখের মধ্যে অকস্মাৎ লেগে যায় চোখ
কথাবার্তা বন্ধ হলে যেভাবে স্তব্ধতা নেমে আসে
কাকভোরে আলো ফোটা শুনশান অনামী স্টেশনে
গরম চায়ের সঙ্গে যেভাবে সকাল এসে যায়

কাল সন্ধ্যাবেলা ঝুঁকে পড়া পড়ন্ত সময়ের পর থেকে
সেভাবে তোমার কথা মনে করছি, সেভাবে তোমায়. . .॥

দাহ


বেশ ক'দিন বৃষ্টির দেখা নেই
উষ্ণতা বেড়েছে একটু একটু করে,-
মাথার ঘাম ভুরু ছুঁয়ে নামছে চোখের পাশ বেয়ে;
দাবদাহে ঘুমচোখের স্বপ্নেরা 
ছাই হয়ে যাচ্ছে পুড়ে !

ভালোবাসা আর বিশ্বাসের গায়ে আগুন লেগেছে,
'আপনজনের হাতের আগুন'-!
জ্বলছে, পুড়ছে আর এগোচ্ছে দেবত্ব প্রাপ্তির দিকে;
পোড়া মন তাও আফিমে বিভোর 'সতী'-র মতো
পুড়তে পুড়তে বাঁচতে চাইছে....... 

ঈশ্বরের অশ্রুধারা বর্ষিত হবে কি?_
জানার অপেক্ষায় আছে অর্ধদগ্ধ অনেক দেহধারী॥ 

উপেক্ষিতা

চোখের দৃষ্টি বর্ষায় ঝাপসা
তবুও দেখতে পাচ্ছি শুধু তোমাকে।
আজ আবারও বুঝলাম,
তোমাকে পাওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।

সবাই নিজের মতো করে পেয়েছে তোমায়,
আত্মীয়, বন্ধু; - শুধু আমি ছাড়া।
পেয়েছি মিথ্যে পাওয়ার মধ্যে সত্যি না পাওয়ার যন্ত্রণা।

আমি নীরবে থাকব তোমার অপেক্ষায়,
বুকভরা হাওয়ার মতো-
শুধু তুমি জানবে না সে কথা।

সশরীরে থাকব অনেক দূরে, যেখানে
আমার ছায়া পড়বে না তোমার চোখে-
তুমি দেখবে পৃথিবীকে, আর আমি তোমাকে।

কোন অভিযোগ নেই-
ব্যর্থতা আর আমি- দু’জনে বেশ আছি।
শুধু জেনো, ‘তোমায় ভালোবাসি’॥




সে

আজ দুপুরে যখন আমাদের পাড়াটা চুপচাপ তখন আমি ছাতের চিলেকোঠায় বসে আকাশ দেখছি। দূর আকাশে এক ঝাঁক সাদা কালো পায়রা উড়ে যাচ্ছে। এখন আনমনে ওর কথা মনে পড়ছে। এখন ও যেন আমার মনের আরোও কাছে চলে এসেছে। মনে হচ্ছে যেন ও বাতাস হয়ে প্রতি পলে আমার হৃদয়ে প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে, অনুভবে বুঝছি কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না।
কখনো মনে হয় ও কে হয় আমার! অন্য প্রাণ, ভিন্ন হৃদয়,- তবু কেন মনে পড়ে, সেই সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার কথা, একসাথে পাশাপাশি মেঠো পথে হাঁটার কথা, কোন কথায় একসাথে হেসে ওঠার কথা, গল্প করার কথা?!
কেন বারে বারে ভাবতে ভালো ওর সেই আদর করে রাগ ভাঙানোর কথা, সেই শীতল অথচ তপ্ত স্পর্শের কথা; আমার আদর পাওয়ার জন্য ওর অকারণে রাগ করার কথা...।
মনের মাঝের একটু অন্যমনস্কতায় যখন ও আসে, তখন ওকে মনে হয় কেমন যেন দূরে... রক্ত মাংসের অন্য একটা শরীর- ভিন্ন মন। হাবভাবে, মুখের গঠনে, চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত একটা অন্যমনস্কতা- একটা মাধুর্য্য,- যা আমাকে ক্রমাগত ওর দিকে আকর্ষন করে চলে।
ওর চুলগুলো যখন হাওয়ায় ওড়ে আর হাত বুলিয়ে ঠিক করে, যখন হঠাৎ আমার অপলক চোখে আচমকা তাকিয়ে হালকা হাসে তখন মনে হয় এমনটা কারোর নেই। কেউ এমন করে তাকায় না, এভাবে কেউ হাসতে পারে না, কেউ ওর মতো ভালোবাসতে জানে না; কেউ ওর মতো ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ছটফট করতে পারবে না।
কোন এক কারণ, যা ওর কথা মনে করিয়ে দেয় ওর বিশেষ কিছু ভাবভঙ্গি- হাঁটাচলা, কথা বলার সময় দুটো ঠোঁটের সচলতায় ... কেমন কথা হারিয়ে ফেলি। মনে হয় ওর ঠোঁট ছোঁয়া শব্দ হই আমি, ওর চুল ছোঁয়া বাতাস হই আমি... ...
মনে হয় এমন একটা দিন... অঝোর ধারায় বর্ষা, আমার সামনে ও... মৃদু বিঠোফেন বাজবে.. আর ঠোঁট ছোঁয়া শব্দের মাধুর্য্যের উষ্ণতা... সেই দিনটার নাম রাখব ‘আদর’।

বেগুনীলতা

এসো আজ তোমার সঙ্গে দু’দণ্ড কথা বলে
নিজেকে ভারমুক্ত করি।
আমি অস্পষ্ট তোমার গল্পের হাত জড়িয়ে 
বেড়ে ওঠা তন্বী বেগুনীলতা।
আমার আকর্ষের আষ্টেপিষ্টে জড়ানো 
অচেনা তোমার গল্প।
যেদিন তোমায় পাবো সেদিন আমার বুক জুড়ে থাকা
নদীজলের নরম ঢেউ বনফুলের গন্ধে মাতবে
দিগন্তরেখার ওপারে যেখানে কালপুরুষের বাস
তার গায়ে লেগে থাকা মেঘ-হাওয়ার স্ফূর্তিমুদ্রাগুলি
বদলে যাবে... লেখা থাকবে তোমার নাম।
ঐ যেখানে দূরে মেঘ-মাটি মিলে যায়
এই কোলাহল থেকে দূরে তুমি আমার হাত ধরে নিয়ে যেও;
আমাকে তোমাতে হারাতে দিও।
আমার অনন্ত অপেক্ষার গল্প লেখা হবে
সাদা পালকের গায়ে... দুই ‘শ’ এর মিলনে॥


প্রেমের গল্প

প্রকৃতির কথা:
---------------------
বুক ফেটেছে ।
মুখ ফোটেনি॥
ধোঁয়ায় জ্বলেছে চোখ।
শরীরে তাপের প্রকোপ॥

পুরুষের কথা:
---------------------
উড়ে বেড়াবো।
ঘুরে বেড়াবো॥
দর যে আমার চরা।
ধরাকে দেবো না ধরা॥
.
.
তারপর... জামাইষষ্ঠী আর দশহরা এল!
পাব্বনে প্রকৃতির ফলরসের ভাণ্ডার উপচে পড়ল!
রূপের বাহার দেখে জলধরের মন কেমন করে উঠল!
মনে হল; আর একবার সাধিলেই আসি...।

আজকের গল্প:
-----------------------
সকাল থেকেই পুরুষের রাগ টুপ্ টুপ্ গলে পড়ছে।
প্রকৃতি তাদেখে ভ্রুকুটি করে কুয়াশায় মুখ ঢাকছে॥

সারাদিন দু'জনার মান অভিমান-
তা দেখে মানব কবি কবি প্রাণ!

কাটল দুপুর, সন্ধ্যা গেল।
ইলিশ, খিচুরি রান্না হল॥

প্রকৃতির কালো এলো চুলে রাত্রি এল-
জলধর এমত রূপে অঝোরে আত্মসমর্পন করল।

বর্ষা এল॥



অনুভূতি

কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। সারাদিন গুমোটের পর একপশলা বৃষ্টি যেন ঠান্ডা করল ধরিত্রীকে। বলতে ইচ্ছা করছে-
এসেছিল বৃষ্টি কেটে গেছে তাপ
ঝরে ছিল বৃষ্টি রেখে গেছে ছাপ।
বৃষ্টি ক্ষণিক, সাময়িকভাবে তার ছাপ রেখে গেল পৃথিবীর বুকে। কিন্তু আমার জীবনে তার ছাপ ক্ষণিক নয়, এ যেন চির সত্য, চিরন্তন। সে আমার মনে দিনের আলো, রাতের স্বপ্ন, হৃদয়ের স্পন্দন, মনের আশা, কন্ঠের ভাষা। ওর মধ্যে নিজেকে হারাই আবার হারানো আমিকে ওরই মধ্যে খুঁজে পাই। তাকে আজও দেখিনি, বিমূর্ত সত্ত্বা সে... অধরা হয়েও নিজের। আমার চোখ খুঁজে বেড়ায় তাকে, আমার কান শুনতে চায় তার কন্ঠ। আমার সত্ত্বার প্রতিটা কোষ তাকে পেতে চায়। আমি যেন আমার নই। শুধু তার কথা গল্পে শুনে হয়ে গেছি তার... নিজেরই অজান্তে। তার প্রেমে হয়েছি ধন্য, পবিত্র, জীবনমুখী, কল্পনাপ্রবণ। জানি না দেখা হবে কিনা, জানি না কোনদিন সে আমাকে চিনবে কিনা... যে ভাবে আমার মধ্যে ওকে চিনি নিবিড় ভাবে... নিজের করে...জানি না... আমি জানি না.... 


ছাই

বহু অপমানে পোড়ে পাতার আগুন
অনুভূতির দাবানল পোড়ায় বুকের পাঁজর
উষ্ণতা ছড়ায় শিরায় শিরায়
স্বপ্নগুলো বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যায়
পোড়া কবিতা খাতায় যন্ত্রণা জন্ম নেয়
'আমাদের কথা',- 'তোর-আমার' হয়ে যায়!

বিদ্রোহ

আমার উদরে হাজার ক্ষুধার্ত ক্ষুধায় কেঁদে মরে
হাজার দুঃখীর চোখ ঝড়ে পড়ে আমার চোখের জলে।
মনোরঞ্জন করে চলা শুধু এ যুগের রীতি
আমার ভেতরে প্রাণটা হারায় সাচ্চা থাকার নীতি।
জ্ঞানের ছোঁয়ায় সভ্য আমরা, সভ্যতারই দাস
দাম দিলে তবে খেতে পাই, দাম দিয়ে করি বাস।
অর্থ যখন শূন্য, আমার পাকস্থলী বন্ধ
চোখের সামনে ঝাপসা জগৎ, সমাজ তখন অন্ধ॥

রাত

মধ্যরাতে 
ঘরের ভেতর মায়াবী আলোর মাখামাখি।
নরম নিস্তব্ধতায় 
মনে মনে চুপকথার ভিড়।
গালের উপর শীতলতার প্রলেপ
আর চোখের তারায় 
মোবাইলের ঘুমকাড়া 'বন্ধুত্বের' আলো।
.
.
জীবনকে দোষ দিই ঘুমোতে চাই তবু ঘুম আসে না!

অবলম্বন

অবেলায় এলি।
যখন সুদীর্ঘ বিষাদী পথ চলে পরিশ্রান্ত আমি।
যখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেয়ায় পরাজিত আমি।
তখন এলি।

মৃত্যুর কোলে বসে আজ বাঁচতে মন চায়।
'অপরাজিতা'ও তো জড়িয়ে ধরার বুক খোঁজে!

মনে হয় বেঁচে থাকি আরোও কয়েক শতাব্দী-
তুই আমি পাশাপাশি বসে দেখি কুয়াশামাখা অরুণোদয়।

আর কোন শীতল রাতে তারা জ্বলা চাঁদোয়া আকাশের নীচে তোর উষ্ণ হাতে হাত রেখে হেঁটে চলি আমৃত্যু!

জোনাকিরা জানে তোর চোখের তারার আলোয় আমি বাঁচি।
থাকনা একটা গল্প 'অপ্রকাশিত'; যার নাম- 'অবলম্বন'॥


শ্রাবণধারা

শব্দমুখর যে শ্রাবণদুপুরে ভিজেছিলাম তোর কথায়
সেদিন বৃষ্টিধারায় মিশেছিল চোখের জল-
গাল বেয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে তা ভাসিয়েছিল 
চোখের দু'কূল।
কেউ জানেনি, কেউ জানবে না তোর নাম।

অসময়ে কোকিল ডাকছে কোন গাছে,
বর্ষার খামখেয়ালি আকাশের গায় নীল জামা
বেশ লাগছে। এর নাম কি রোম্যান্স?
প্রেমিক তুই কবির কানে বলে দে॥ 

ঝড়

এ তুচ্ছ জীবনের মেঠো পথে
নিবিড় হাতের উষ্ণতার আশ্বাস চেয়েছিলাম।
চারিদিক ত্রস্ত করে এল ঝড় নিকষ কালো মেঘ নিয়ে।
হাতের উষ্ণতা গেল ধুলোয় হারিয়ে।
আমি এক পথভ্রষ্টা একেলা নদীপারে।
ভীতা সন্ত্রস্তা ব্যথিতা একাকিনী অপেক্ষা করছি- সূর্যোদয়ের

রোম্যান্স

ঘুম মাখা ভোরে প্রেমিকের চোখে
লুকোচুরি খেলে নারী রহস্য।
কখনো ধরা দেয় টুপ্ টুপ্ ভেজা চুলের
গন্ধে বিভোর মাদকতায় বা
সদ্যস্নাত ভেজা ঠোঁটের পেলবতায়।
প্রেমিকের বুক হু-হু করে;
যুগ যুগ ধরে পথ হারাবার পথ খোঁজে।
এ রহস্যের চোখের তারায় 
বহু তারা খসেছে-জন্মেছে।
প্রেমিক তুমি অনন্ত-পুরুষের অনাদি রূপ
প্রেমের রসায়ন সাগরে ডুব সাঁতার দাও,
নাবলা কথা ঠোঁট ছুঁয়ে জেনে নাও।
আজ থাক না কিছু রহস্য অজানা!

Most Popular Posts