ফুল

একটা ফুলকে দেখার একটা অনাবিল আনন্দ ও তৃপ্তি আছে। ফুল দেখলে অজান্তেই আমাদের মুখে সেই আনন্দের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। হিন্দিতে একটা শায়েরি পড়েছিলাম। মানে ছিল, তুমি যদি একটা গোলাপকে পছন্দ হয়েছে বলে গাছ থেকে ছিঁড়ে নাও, তাহলে সেটা ভালোবাসা নয়, তুমি গোলাপটিকে ভালোবাসলে গাছের গোড়ায় জল দিতে, গাছটার যত্ন করতে। ভালো লাগা আর ভালোবাসার পার্থক্য আমরা নিজের মতো করে একসময় বুঝতে শিখে যাই। তবে ফুলের মতো নিবেদিতপ্রাণ ত্যাগ শিখে জীবনে প্রয়োগ করা খুব কঠিন কাজ। শুধু ফুল কেন, জল, মাটি, আকাশ, বাতাস, আগুন, প্রকৃতির প্রত্যেক অংশই যেন পরের জন্য। ছোটবেলায় কবিতায় পড়েছিলাম, 'প্রত্যেকে আমরা পরের তরে'। 
এই ছুটন্ত জীবনে যখন অন্য শহর-রাজ্য-দেশে থাকা ব্যস্ততম বন্ধু/বান্ধবী/আপনজন সপ্তাহে একবার হলেও সময় বের করে ফোন করে খোঁজ নেয় বা ভিডিও কলে একবার দেখতে চায়, আমার জন্য প্রার্থনা করে তখন মনের মধ্যে একটা ফুলের বাগান পাই। বুকের ভেতর আপনভাবের সুবাস পাই। অনেক মানুষের, অবলা জীবের ভালোবাসা আমি পেয়েছি, পাইও। আর কি আছে! ভালোবাসার এই বিনি সুতো টুকুই রয়ে যাবে। বুকের বাষ্পে, চোখের পাতার উষ্ণতায়, অস্ফুট স্বরের মাঝে, দীর্ঘশ্বাসের ভারে যন্ত্রণারা চাপা পড়ুক। ভালবাসা সব সময় জিতে যায়। ভালবাসা যে প্রার্থনা। ত্যাগ। করুণা। আশীর্বাদ। শুভ কামনা। আলো। জল। মাটি। একটা ফুল। 

সবাই ভালো থেকো, ভালো রেখো। 

শুভ্রা চক্রবর্ত্তী।

Subhra Chakraborty

কাহিনী

রাতের গায়ে বনফুলের সৌরভ আছে।
উদ্ধত, বন্য, আদিম সে গন্ধ।
নিকষ কালো আকাশের বুকে মুখ রেখে
তারারা সে গন্ধে মাতোয়ারা হয়।
এ আদরের গল্প রোজ রাতে ঘাসেরা
মাথা তুলে শোনে।
তাই লাজে রাঙা হলে
ঘাসের কপালে শিশির জমে।

তুমি আমি এই প্রকৃতির কোলে
সাংসার বন্ধনে বিভোর হয়ে
রাত কাটাই। রোজ ভোর হয়।
খাদ্য-খাদকের সম্পর্কে
ভয় পেতে পেতে
ভালোবাসতে ভুলে গেছি।

রাত নেমেছে গভীর।
অন্ধকার পেয়ে বসেছে।
ভয় করছে।
এসো পাশাপাশি বসি।
একটু আদিম হই।
যান্ত্রিক জীবনে প্রকৃতি ফিরে আসুক।

তুমি আমি মিলে নতুন গল্প লিখি॥

শারদীয়া

একদশীর রাতে চন্দ্রানী হাসে
মাধবীলতার সুবাসে শিশিরের গায় কাঁটা দেয়।
মৃন্ময়ী মা দুগ্গার গালের সিঁদুর জলে ভেসে যায়-
মন খারাপের সুর বিসমিল্লার সানাইয়ে।
আজ বিজয়ার ঘোরে ঢুলু ঢুলু চোখ বিরহ ভুলতে চায়।
শরতের মায়াবী আকাশ, রাত পরীর এ রূপ কোন অজানা মোহের হাতছানি দেয়।
জেগে থাকি... এমনি শরতের পূর্ণিমাভাসা রাতের  আগামী সম্বোধনের অপেক্ষায়.... 'কো জাগরি?'
©Subhra Chakraborty

কবিতার জন্ম


সকল চাওয়ার মাঝে কেমন নিষ্পলক আকুতি।
যখন চাওয়ার কথা বলতে গিয়ে ঠোঁটের ভাষা থমকে দাঁড়ায়-
তখন আয়নার ধুলো মুছতে
কবিতার নরম কাপড় লাগে। 
চিনচিনে বুকে তা চুপি চুপি জন্মায় 
যিশুর মতো... 
তার আভা লুকানো যায় না। 
কোন পাগলা তিন ভবগুরে সাধু 
আকাশের তারা গুনতে বেড়িয়ে 
সে কবিতার ছন্দের আভা খুঁজে নেয়। 
কবিতা প্রকাশিত হয়, এভাবেই, চিরকাল...॥

সবুজতা

প্রকৃতির কোলে বাস করেও জীবনটা বড় যান্ত্রিক।
গাছেদের নিবিড় ছায়ায় 
আমাদের যৌবন কেটেছিল।
আজ ছায়াও সঙ্গ ছেড়েছে!
এই একাকীত্ব সত্যের মতো নিষ্ঠুর।
খ্যাপার মতো খুঁজে খুঁজে ফিরি সবুজতা-
চারপাশে, জীবনে, মনের গহনে।
এই ব্যথাভরা বুকে এখনো আশার জায়গা আছে। 
আশা আছে। প্রাণ আছে।
এই বিশ্বাসে পড়ন্ত বেলার পড়ে ঘুম আসে।
আগামী ভোরের আশায়...॥

এখনো অপেক্ষায়

আমার প্রেম, দুঃখ, জড়তা, অভিমান, অপমানগুলো 
ঘুমুর করে সাদা বকের পায়ে বেঁধে দিয়েছি।
নীল আকাশের গায় সাদা মেঘ মেখে 
সে ঘুমুর বকের সাথে উড়ে যায়। 
বালিশে মাথা রেখে ভাবি হয়তো সেই বক গিয়ে বসেছে তোমার বাড়ির পাশের নদীপারে, 
শিশিরের জলে ভেজা নিঝুম রাতে।
ঘুমুরের সেই শব্দ তোমার কানের পাতায় হাত রাখে।
তুমি তা জানো না কিছু, 
ঘুমন্ত প্রাণ, কথা-গান-ভাষাহীন।
তবু আমার প্রাণের অনুভূতির সুরভী পাবে স্বপ্নের দেশে।
হলুদ ঘাসের ভিড়ে, মরণের ঘোরে, শুষ্ক নদীতটে-।
দেখবে আমি অনন্ত অপেক্ষায় তোমার জন্য একাকী বসে আছি, 
অনন্ত অপেক্ষায়...॥

আকাঙ্খা


পৃথিবীতে তিরিশ বছর কাটিয়ে দেবার পর এখন মাঝে মাঝে শৈশব পেয়ে বসে।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে মণি-মুক্তো ছড়িয়ে যায়
পুকুর ধারের পিয়াড়া গাছের ছায়ায়।
যেখানে আজও ঢিল দিয়ে টানা গন্ডীর ভিতর 'পাতা লুকোনো খেলার' কচি আমপাতা
লুকোনো আছে মাটির ভিতর।
মনে হয় আজ স্মৃতির পাতাল রেলে করে গিয়ে খুঁড়ে বের করি সেই পাতার টুকরো মোড়া
শৈশবের হাসি-আনন্দ-সরলতার শব।
আজ এই পরিণত পুরাতন শরীরে
বেঁচে ওঠ তোরা বিদ্রোহী কবিতার মতো।

নয়তো আয় হৃদয়ের ছায়ায়, গোধূলির মেঘে,
এই ডুবন্ত জাহাজের মাস্তুলে।

এখন অনেক রাত, আয় তোরা ভোরের স্বপ্ন হয়ে।

আমি অপেক্ষায় আছি।
থাকব অপেক্ষায়॥

Most Popular Posts